আজ ১৭ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১লা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

শিক্ষায় পরিবর্তনের উদ্যোগঃ ব্যতিক্রমের সূচনা হবে কি?

মঞ্জুরে খোদা টরিক


শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, প্রায় ১০ বছর আগে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল। ১০ বছর একটি দীর্ঘ সময়। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এখন সময় এসেছে শিক্ষানীতি সংশোধন করা, পরিমার্জন ও সংযোজন করার। তাই সরকার শিক্ষানীতি সংশোধন করার উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের আয়োজনে ‘এডুকেশন টেকনোলজি হ্যান্ড এগ্রিকালচার ট্রান্সফর্মেশন’ শীর্ষক এক অনলাইন আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রীর এমন বিবেচনার জন্য তাঁকে সাধুবাদ জানাই। তার এই ভাবনা কতটা সৎ, আন্তরিক তা বোঝা যাবে এই সংস্কার-পরিবর্তনে তারা কি ধরনের উদ্যোগ-পদক্ষেপ নিচ্ছেন তার উপর। কি ধরণের সংশোধন করা হবে পত্রিকায় এ নিয়ে আমি ৬টি বিষয়ের কথা জেনেছি। এখানে তা উল্লেখ করছি। সূত্র: সমকাল।
শিক্ষা নিয়ে মন্ত্রীর উদ্যোগ-সুপারিশঃ
(১) শিক্ষার গুণগত মান অর্জন। সব পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।
(২) একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রণয়ন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
(৩) সাইন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং আর্টস এন্ড ম্যাথসের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
(৪) শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি করার পাশাপাশি প্রকৃত মানুষ তৈরি করতে চাই।
(৫) এজন্য সরকার সততা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম, কমিউনিকেশন স্কিল, টিম বিল্ডিং, ক্রিটিক্যাল থিংকিং প্রবলেম সলভিংসহ বিভিন্ন সফট স্কিলের ওপর গুরুত্বারোপ করছে।’
(৬) অনলাইন শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন, অনলাইনের মাধ্যমে শিখতে পারে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সে সুযোগ রাখতে হবে।’
শিক্ষা নিয়ে মন্ত্রীর উদ্যোগে আমার পরামর্শঃ
শিক্ষামন্ত্রীর শিক্ষার কতদূর, কি পরিমান পরিবর্তন করতে পারবেন তা সময়ই বলবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা গেলে আলোচনা সুনির্দিষ্ট করা যেতো? তবু শিক্ষা সংশোধনের জন্য এ ভাবনাকে গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী মনে করি। সরকারের উদ্যোগ সফল হতে পারে যদি এক্ষেত্রে তারা সত্যি কিছু কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহন করেন। ১০ বছর পর শিক্ষাসংস্কারের এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে এখানে কয়েকটি পরামর্শ রাখছি। শিক্ষার নীতি-ভাবনায় এমন উদ্যোগ ভাবলে শিক্ষার গুণগতমান অনেকটা বাড়বে, আপনার উদ্যোগও প্রশংসিত হবে। নচেত বাংলাদেশের শিক্ষা যে অচরায়তনে ঘুরপাক খাচ্ছে, সেখানেই থেকে যাবে।
[১] দেশে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে পরিবর্তনশীল একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন করা উচিত। যাদের কাজ হবে শিক্ষার বিষয়গুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষন করে শিক্ষাসংস্কারে শিক্ষামন্ত্রনালয়কে সহায়তা করা। বড় বা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার-পরিবর্তনগুলো দশবছর পরপর গ্রহন-অন্তর্ভূক্ত করা। জাপানে শিক্ষার উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় এমন ব্যবস্থা কার্যকর আছে, এবং তারা এর ফলও পাচ্ছে।
[২] সমন্বিত শিক্ষা বলতে মন্ত্রী কি বলেছেন জানি না, তবে জাতীয়ভাবে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সমন্বিত ভর্তি, শিক্ষা, পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করার কথা ভাবুন। সমন্বিত শিক্ষা আইনের বিষয়টি পরিস্কার না হলেও শিক্ষার সমন্বয়ের বিষয়টি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয়।
[৩] শিক্ষাকে দেশ-বিদেশের শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে প্রয়োজনীয় দক্ষতা-যোগ্যতার ভিত্তিতে তৈরী করতে হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় গবেষণা থাকতে হবে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবণতার সাথে কোথায় কি পরিমান দক্ষ শ্রমশক্তি দরকার? এবং তারজন্য কি ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, দক্ষ লোকবল, প্রস্ততি ও পরিকল্পনা প্রয়োজন।
[৪] বাংলাদেশে পেশাজীবী শিক্ষার্থী গড়ে তোলার জন্য, শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী কি পরিমান প্রতিষ্ঠান আছে। তার পরিষ্কার হিসেবে প্রকাশ করা দরকার। এক্ষেত্রে সমন্বয় ও সামঞ্জস্য জরুরী।
[৫] বাংলাদেশে প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর একজন মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে। কওমী মাদ্রাসার ধারা হচ্ছে বাংলাদেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম শিক্ষার ধারা । তারমানে বাংলাদেশে শ্রমশক্তির এক তৃতীয়ংশ কওমী মাদ্রাসায় যায়। মাদ্রাসা শিক্ষাকে বাইরে রেখে এ সংস্কার অর্থপূর্ণ হবে না। এই বিশাল মানবসম্পদকে বাইরে রেখে তাদেরকে সমন্বিত শিক্ষা আইনের পরিকল্পনায় না এনে, এ আইনের কার্যকর হবে খন্ডিত ও অসম্পুন্ন। এ জন্য সমন্বিত শিক্ষার সংজ্ঞা ও পরিধি কতটুকু তা জানা দরকার।
[৬] মাদ্রাসা শিক্ষাকে সমন্বিত শিক্ষার আওতায় আনতে সেখানে ব্যাপক পরিকল্পনা দরকার। আমার মনে হয় না সরকার এখানে হাত দেবেন বা এখানে কিছু করতে পারবেন! বিভিন্ন ধারা ও স্তরের শিক্ষাকে সমন্বিত শিক্ষা আইনে কিভাবে সমন্বয় করা হবে সেটা পরিষ্কার নয়, এটা স্পষ্ট হওয়া উচিত।
[৭] শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রধান যে কাজ করতে হবে শিক্ষাকে- প্রচলিত ক্লাসকেন্দ্রীক, তত্ত্ব ও মুখস্ত নির্ভর, বাৎসরিক পরীক্ষাব্যবস্থায় আটকে না রেখে, বছর বা সেশনব্যাপী মূল্যায়নে ব্যাবস্থায় নিয়ে আসা। বর্তমান তত্ত্ব ও মূখস্তনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেড়িয়ে তাকে প্রয়োগিক ও উৎপাদনমূখী শিক্ষাব্যবস্থায় রুপ দিতে হবে।
[৮] শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম ও নীতিনৈতিকতার উন্নতির কথা বলা হয়েছে। এ জন্য প্রচলিত ধর্মীয়শিক্ষা নয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে নৈতিকশিক্ষা বা নাগরিক শিক্ষা চালু করতে হবে। উন্নত সব দেশেই ব্যবস্থা বিদ্যমান এবং তারা এর ফল পাচ্ছে। নীতিনৈতিকতা শুধু পাঠে আসে না, তা চর্চা ও প্রয়োগের মাধ্যমে আসে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিবেশ ও সামাজিক ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে।
[৯] করোনা মহামারীতে উন্নত বিশ্বে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যায়ের ক্লাস-পরীক্ষা সব অনলাইনেই হচ্ছে। এছাড়া কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমননিতেই বিভিন্ন পর্যায়ে লেখাপড়ার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তারজন্য সে ধরণের প্রযুক্তিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন দরকার। আমাদের দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ সুবিধা এখনো তৈরী হয়নি। প্রথমে সর্বত্র এ সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে।
[১০] বাংলাদেশের যে শিক্ষা বাজেট তা দিয়ে এ যুগের ও বিশাল জনগোষ্ঠীর চাহিদা পুরণ সম্ভব নয়। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ এখনও জাতীয় আয়ের ২ শতাংশের আশেপাশে। যেখানে জাতিসংঘসহ সবার দীর্ঘদিনের সুপারিশ এই ব্যায় বাড়িয়ে ৬ শতাংশ করার কিন্তু কোন শাসকই তা করেননি। আমাদের দেশে শিক্ষাব্যায়ের বড় অংশই চলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায়, শিক্ষা উন্নয়নের জন্য আলাদা থোক বরাদ্দ থাকে না। এ জন্য শিক্ষা উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য বরাদ্দ অনেকগুন বাড়াতে হবে।
[১১] শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে সক্ষম লোকবল বাড়তে হবে, তাঁদের নিয়োগ দিতে হবে। দেশ যারা আছেন তাঁদেরকে এবং বিদেশে অবস্থানরত বিশেষজ্ঞদের দেশে ফিরিয়ে এনে এক্ষেত্রে সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে হবে।
[১২] শিক্ষকদের বেতন, সুযোগ-সুবিধা, মর্যাদা বাড়াতে হবে। এই পেশাকে আকর্ষণীয় ও সম্মানজনক করার ব্যবস্থা নিতে হবে। জাপানে শিক্ষকতার পেশা অত্যন্ত প্রতিযোগীতামুলক। কেননা এ পেশাতে সম্মান, মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা অনেক বেশী।
[১৩] সমন্বিত শিক্ষা সুফল পাওয়া যেতে পারে যদি বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের জন্য আঞ্চলিক ভর্তিপদ্ধতি ব্যবস্থা চালু করা হয়। এর মানে হচ্ছে যে যে এলাকার বাসিন্দা, তাকে সে এলাকায় বিদ্যালয়ে যাওয়া বাধ্যতামুলক করতে হবে। তাতে বিভিন্ন মানের-পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সংমিশ্রনে শিক্ষার একটি সমন্বিত মান তৈরী করতে সাহায্য করবে। শিক্ষার পণ্যায়ন ও বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করতে হবে।
[১৪] বাংলাদেশের কারিগরী-ভকেশনাল ও পেশাভিত্তিক শিক্ষাকে সরসারি দেশের বিকাশমান শিল্পের সাথে সংযোগ রেখে গড়ে তুলতে হবে। যেমন, সেবাখাত (স্বাস্থ্য, পরিবহন, সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান), শিল্পপ্রতিষ্ঠান (গার্মেন্টস শিল্প, চামড়া, যন্ত্রপাতি), কৃষিভিত্তিক শিল্প (পাট,পোলট্রিফার্ম, খাদ্যশস্য ইত্যাদি)। এগুলোর চাহিদার ভিত্তিতে দক্ষ কর্মীবহিনী গড়ে তুলতে হবে।
[১৫] ভাষা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভাষা হচ্ছে শিক্ষার চাবি। এই চাবি যার হাতে থাকবে সেই শিক্ষাগ্রহন করতে পারবে। ভাষার জন্য জীবন দেয়া জাতির ভাষার ক্ষেত্রে কোন জাতীয় নীতিমালা ও সমন্বয় নেই। উন্নত বিশ্বে অংক-গণিতকেও একটি ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি ধারায় শিক্ষার মাধ্যম বাংলা হলেও তার অবস্থা বিশৃংখল। ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের সংস্কৃতিকেও বিকৃত করছে।
আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা কথা বলতে পছন্দ করেন এবং অনেক অসলগ্ন কথাবার্তা তারা বলেন। অনেক ক্ষেত্রে চমকদেয়ার মত সুন্দর কথাও বলেন। কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হয় না। যা যেখানে ছিল তা সে অবস্থাতেই থাকে বা তারও অবনতি ঘটে। শিক্ষার যে কিছুটা অসম্প্রদায়িক চেহার ছিল তাও নানা পরিববর্তনে ক্ষতিগ্রস্থ করা হয়েছে। সে সমীকরণে বলা যায় সমন্বিত শিক্ষার এ ভাবনা-উদ্যোগও যে প্রজেক্ট-প্রকল্প ও কথামালার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, এমনটিই মনে হয়। এটি সংশ্লিষ্ট ও নীতিনির্ধারকদের আর্থিক-বাণিজ্যিক সুবিধার বিষয় না হয়ে যদি অন্য কিছু হয়, তবে তা হবে এক ব্যতিক্রমের সূচনা।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর...

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তী

error: Content is protected !!